ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত ৫ হাজার ছাড়িয়েছে, প্রত্যন্ত গ্রামে ফুরিয়ে যাচ্ছে খাদ্য

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ১২:০১ পিএম
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত ৫ হাজার ছাড়িয়েছে, প্রত্যন্ত গ্রামে ফুরিয়ে যাচ্ছে খাদ্য

ভেনেজুয়েলার উপকূল ধরে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক পেরিয়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ট্রাকের একটি বহর এগিয়ে যাচ্ছে| পেছনে ফেলে আসছে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত শহর কাতিয়া লা মার|

ট্রাকগুলো যাচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রাম চিচিরিভিচে দে লা কোস্তার দিকে| গত ২৪ জুনের জোড়া ভূমিকম্পে গ্রামটি তুলনামূলকভাবে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেলেও, এর পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাইরের সহায়তা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে| খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

খাড়া পাহাড়ি পথ, বিপজ্জনক বাঁক এবং কাঁচা রাস্তা এই পর্যটননির্ভর এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পর্যটকদের আগমন বন্ধ হয়ে গেছে, পাশাপাশি মাছ বিক্রিও কমে গেছে।

দেশটিতে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অন্তত ৫ হাজার ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শত শত ভবন ধসে পড়েছে|

চিচিরিভিচে গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ২ হাজার| দুর্যোগের পরের দিনগুলোতে নেদারল্যান্ডস হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়|

এএফপির প্রতিবেদক বৃহস্পতিবার গ্রামটি পরিদর্শন করেন| সেদিন ডব্লিউএফপি গ্রামের প্রধান চত্বরে বাসিন্দাদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছিল| তিন মাসের জন্য নেওয়া ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে|

৫৪ বছর বয়সী আন্দ্রেইনা লিয়েন্দো বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, এখানে কোনো প্রাণহানি হয়নি| তবে কিছু জিনিসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে|’

চার বছর বয়সী ছেলে আন্দ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৫০ কেজি চাল, পাস্তা, ময়দা, তেল, লবণসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করেন তিনি| তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুটা সহায়তা পাচ্ছি, আর এভাবেই টিকে আছি|’

এই খাদ্যসামগ্রী এক মাস চলার কথা| একদিনে ৪৯৮টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ২৫ টন খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে|

জাতিসংঘের এই সংস্থা ভূমিকম্পকবলিত এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং গড়ে ওঠা অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরগুলোতে প্রায় ৫ লাখ টন খাদ্য সরবরাহ করবে|

ডব্লিউএফপির জরুরি কার্যক্রম সমš^য়কারী মার্ক-আন্দ্রে প্রো এএফপিকে বলেন, "আজ আমাদের লক্ষ্য হলো, এই সম্প্রদায়কে এমন একটি কঠিন সময় পার হতে সহায়তা করা, যখন তাদের কোনো আয় থাকবে না| একই সঙ্গে তারা যেন নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা|"

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে লা গুয়াইরার মতো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর দিকেই সাধারণত বেশি মনোযোগ থাকে| তবে ভূমিকম্পের পর প্রথম দিন ও সপ্তাহগুলোতে এসব প্রত্যন্ত সম্প্রদায়ের দিকেও নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ|

৪০ বছর বয়সী উইলফ্রাঙ্ক লিয়েন্দো ও তার ২১ বছর বয়সী ছেলে এদুয়ার্দো খালি পায়ে একটি ছোট জলধারা পার হয়ে মাটির সরু পথ ধরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন উইলফ্রাঙ্কের বৃদ্ধ মায়ের কাছে|

৭৯ বছর বয়সী বিধবা মার্গারিটা মায়োরার সঙ্গে থাকেন আরও পাঁচজন| তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সদস্য বেশি নয়, তাই এই খাবার বেশ কিছুদিন চলবে|’

ভূমিকম্পে তার বাড়ির কিছু ছাদে ফাটল ধরেছে| আবারও দুর্যোগের আশঙ্কায় তিনি এখন বারান্দায় ঘুমান বলেও জানান|

তার ছেলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা পর্যটনের ওপর নির্ভর করি| পর্যটক না এলে আমরা সমস্যায় পড়ব|’

তিনি বলেন, ‘আমি একজন কৃষক| আমাদের কোনো আয় নেই, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার মতো ক্রেতাও নেই|’

এদিকে ৪৫ বছর বয়সী পরিচ্ছন্নতাকর্মী লেইদা বেলো একাই ত্রাণসামগ্রী বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন| তার বাড়ির কয়েকটি দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং একটি দেয়াল ধসে পড়েছে|

তিনি বলেন, ‘এটি মেরামত করার সামর্থ্য আমার নেই|’ ভেনেজুয়েলায় প্রাণহানির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের বেঁচে থাকতে হবে, জীবন চালানোর পথ খুঁজে নিতে হবে|’

শহরের পরিচিত মুখ আদালবের্তো মায়পোরা একটি নির্জন ˆসকতে নিজের মাছ ধরার নৌকাটি খুঁটিয়ে দেখছেন| পাহাড়ঘেরা ওই ˆসকতে এখন খুব কম মানুষই আসেন|

তিনি এএফপিকে বলেন, জেলেরা এখনও সমুদ্রে যাচ্ছেন| তারা কিছু মাছ গ্রামবাসী এবং ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে বিতরণ করছেন| তিনি জানান, জ্বালানি খরচ সরকার বহন করছে|

৭০ বছর বয়সী মায়পোরা বলেন, ‘নগদ টাকা নেই| পর্যটকরা এখানে না এলে আমরা মাছ বিক্রি করব কার কাছে?’ দুর্যোগে অনেক স্বজন হারিয়েও তিনি আশাবাদী| তিনি বলেন, ‘আশা করি পরিস্থিতি ভালো হবে|’

এম

Link copied!